ব্রেকিং নিউজ

রাত ১০:৫৫ ঢাকা, বৃহস্পতিবার  ১৯শে জুলাই ২০১৮ ইং

এরশাদ
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

আ. লীগের দুঃশাসনে মানুষ অস্থির-শ্বাস বন্ধ : এরশাদ

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, মানুষ আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে অস্থির হয়ে গেছে। মানুষের শ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন,বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা শূন্য। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে তারা নির্বাচিত হতে পারবে না। তাই জাতীয় পার্টিকে অবহেলা করবে না। জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় যেতে সাহায্য করার জন্য নয়, নিজেরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য শরিক থাকতে চায়।

রোববার দুপুরে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে এসব কথা বলেন এরশাদ।

এরশাদ বলেন, জাতীয় পার্টির এবার আমাদের শ্লোগান- আমরা ভাঙবো দুর্নীতির প্রাচীর। আমরা ভাঙবো নিপীড়নের প্রাচীর। আমরা ভাঙবো দুঃখের প্রাচীর। আমরা ভাঙবো দুঃশাসনের প্রাচীর।

সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কড়া সমালোচনা করে সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেন, একটা কথা আছে আল্লাহর হুকুম ছাড়া গাছের পাতা নড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থা এখন এমন শেখ হাসিনার কথা ছাড়া একটা গাছের পাতাও নড়ে না। কিছুই হয় না। প্রশাসন চলে না। এখন দলীয়করণ সর্বত্র। সব ব্যাংক খালি। ব্যাংকে টাকা নাই। লুটপাট করা হয়েছে। পানামা পেপারসে সব নেতার নাম আছে। দেশের টাকা পাচার করা হয়েছে। তাদের কোনো বিচার নাই।

তিনি দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বর্তমান সরকারের আমলে বেশি নারী নির্যাতন হচ্ছে।দেশে এখন নারী নির্যাতন একটা খেলায় পরিণত হয়েছে। যেন দেশে নারী হয়ে জন্মগ্রহণ করাই অপরাধ।

এরশাদ বলেন, গত দুই মাসে ২৮৭ জন নারী ধর্ষিতা হয়েছে। শিশুরা ধর্ষিত হচ্ছে। স্কুলে যাওয়ার পথে শিশু ও কিশোরীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। বাধ্য হয়ে বাবা-মারা বাল্য বিয়ে দিচ্ছেন। যে সরকার মা-বোনদের ইজ্জত করতে পারে না। তাদের ক্ষমতায় থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা কখনও ঘটেনি।

দেশের সাধারণ মানুষের কাছে জাতীয় পার্টির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে উল্লেখ করে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, আমি যেখানে যাই, সেখানে মানুষের উত্তাল তরঙ্গ, উৎসাহ, উদ্দীপনা দেখি। মানুষ জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় বসাতে প্রস্তুত। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে আমরা জিতবো। আমাদের কেউ হারাতে পারবে না। ক্ষমতায় যাব। মানুষ আর দুই দলকে দেখতে চায় না।

তিনি বলেন, বিএনপির অবস্থা ভালো না। তারা নির্বাচনে আসুক আর না আসুক জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেবে। বিএনপি না আসলে আমরা ৩০০ আসনে নির্বাচন করব। দেশের মানুষ দুই দলকে চায় না। জাতীয় পার্টি ছাড়া আর এই দেশে কিছুই হবে না। আমরা প্রাদেশিক ব্যবস্থার শাসন চাই। একজনের হাতের শাসন চাই না। সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। সিল মারার নির্বাচন চাই না। বেকারমুক্ত দেশ চাই। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে এরশাদ বলেন, আমার ওপর অত্যাচার করে কেউ টিকতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে আমরা ক্ষমতায় বসিয়েছিলাম। ৬ বছর জেলে ছিলাম। একলা ছিলাম। ১২টি ঈদ করতে পারিনি। হাসপাতালে নেয়া হয়নি। আমি মারা যাব বলা হয়েছিল। কিন্তু আমি মরিনি। এটা আল্লাহর রহমত। এবারের আমাদের নির্বাচনে থাকতে হবে। এবারের নির্বাচন আমাদের বাঁচা মরার লড়াই। ভুল করলে চলবে না। ক্ষমতায় যাব। পারিবর্তন আসবে। ৬০ টাকার চাল খাওয়া লাগবে না।

রংপুরে জাতীয় পার্টি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রংপুর জাতীয় পার্টির দুর্গ। সেখান থেকে কয়েকটা পাথর সরে গিয়েছিল। আবার সে পাথর নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা ছাড়া কেউ সরকার গঠন করতে পারবে না। আমাদের সহযোগিতা নিয়ে ৯১ সালে বিএনপি এবং ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু তারা জাতীকে দুর্নীতি আর দুঃশাসন উপহার দিয়েছে।

এরশাদ দলীয় নেতাকর্মীদের বলেন, বৃহত্তর রংপুরের ২২টি আসন আপনারা আমাকে উপহার দেন। আমরা ক্ষমতায় যাব।

তিনি বলেন, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার দিয়ে যানজট নিরসন হবে না। ঢাকা এখন বসবাসের উপযোগী নয়। দেশের ১৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে ১০০টি বেসরকারি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন টাকা দিয়ে সনদ কেনা যায়। সেখান থেকে বিবিএ, এমবিএ পাশ করে বেকার থাকছে তরুণরা। তাদের চাকরি নাই। আমাদের সময় ভালো শিক্ষা ছিল। চাকরি ছিল। কাজ ছিল। উন্নয়ন ছিল।

শ্রমিকদের প্রসঙ্গ এনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, দেশে এখন ৬ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিক। তাদের শিক্ষা নেই। বিদেশে যারা শ্রমিক হিসেবে যায় তারা রাস্তায় ঝাড়ুদারের কাজ করে। লজ্জা লাগে আমাদের। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল করা দরকার। যাতে টেকনিক্যাল জ্ঞান নিয়ে শ্রমিকরা দেশের বাইরে যেতে পারে। এরশাদ নিজের আমলে করা উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন, আমি ৪৬০টি উপজেলা করেছিলাম। উপজেলায় আদালত করেছিলাম। ডিভিশনে হাইকোর্ট করেছিলাম। খালেদা জিয়া সব বাতিল করেছেন। আমি ঋণের সহজ নীতি করেছিলাম। ১০ হাজার কিলোমিটার রাস্তা করেছিলাম। যমুনা সেতুর কাজ শুরু করেছিলাম। ১ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৮৮ সালে ভিত্তিপ্রস্তর দিয়েছিলাম। বিশ্ব ব্যাংক কে বলেছিলাম, টাকা দাও, ওরা বলেছিল তোমরা গরীব মানুষ টাকা শোধ করতে পারবে না। তারপর আমি সার সার্জ ধার্য করে টাকা সংগ্রহ করেছিলাম। অথচ উদ্বোধনের সময় আমাকে দাওয়াত পর্যন্ত দেয়া হয়নি।

চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকে যৌক্তিক আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, অব্যাহত আন্দোলনের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনের দুঃখে কোটা পদ্ধতি বাতিল করেছেন। আমার মনে হয়, সবক’টি কোটা পদ্ধতি বাতিল করতে তিনি নিজেও চান না। আগে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যে ৩০ ভাগ কোটা ছিল। তা ঠিক ছিল না। মাত্র ২ লাখ মুক্তিযোদ্ধার জন্য এত কোটার প্রয়োজন কেন? এটা অযৌক্তিক ছিল। ফলে কোটা সংস্কার করে দিলেই চলবে। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কিছুটা হলেও কোটা পদ্ধতি থাকা উচিত।

সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের সংবিধানে আছে কোটা পদ্ধতি। সে কারণে কোটা পদ্ধতি থাকতেই হবে। তবে এটা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। এটা কারও পক্ষেই বাতিল করা যাবে না।

জাতীয় পার্টির রংপুর জেলা সম্মেলনকে ঘিরে সকাল থেকে পাবলিক লাইব্রেরি মাঠ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির আহ্বায়ক এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গার সভাপতিত্বে সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন, পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ, রংপুর সিটি মেয়র ও কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব.) খালেদ আক্তার, প্রাইম-সনিক গ্রুপের চেয়ারম্যান ডা. আক্কাস আলী সরকার, সালাহ উদ্দিন, শওকত আলী চৌধুরী এমপি, শাহানারা বেগম, কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এস.এম. ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, মহানগর সেক্রেটারি এসএম ইয়াসির, পীরগঞ্জ উপজেলা সভাপতি নুরে আলম যাদু, বদরগঞ্জ উপজেলা সভাপতি আসাদুজ্জামান সাবলু চৌধুরী, গঙ্গাচড়া উপজেলা সভাপতি সামসুল আলম, পীরগাছা উপজেলা সভাপতি শাহ মাহবুবুর রহমান, কাউনিয়া উপজেলা সেক্রেটারি মোশাররফ হোসেন প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাজী আব্দুর রাজ্জাক। সম্মেলনে রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি হিসেবে প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গা এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ভাইস চেয়ারম্যান এস.এম. ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীরের নাম ঘোষণা করে তাদেরকে ৩ মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশ দেন এরশাদ। – যুগান্তর