ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৬:৪২ ঢাকা, মঙ্গলবার  ২৪শে এপ্রিল ২০১৮ ইং

আয়কর ফাঁকির সন্দেহে দুশতাধিক চিকিৎসকের ব্যাংক হিসাব তলব

Sheersha Mediaশীর্ষ মিডিয়া ১১ অক্টোবর ঃ   দুই শতাধিক খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রকৃত আয় গোপন করে বড় অংকের কর ফাঁকি দেয়ার সন্দেহে তাদের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়। এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ইতিমধ্যেই ৫৩৭ চিকিৎসকের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল থেকে প্রত্যেকের আয়কর নথি সংগ্রহ করেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের নামি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ৯০ শতাংশই প্রকৃত আয় গোপন করে মোটা অংকের কর ফাঁকি দিচ্ছেন। জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, গাড়ি আর দেশে-বিদেশে বিশাল অংকের সঞ্চয় থাকলেও তা গোপন করা হচ্ছে। এনবিআরের চেয়ারম্যানের নির্দেশে গত ২০ দিনে বিভিন্ন পর্যায়ের সিনিয়র চিকিৎসকদের ব্যাংক হিসাব তলব শুরু করেছে সিআইসি। প্রতিদিনই বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গোপনীয় চিঠি যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে এমন সব চিকিৎসকের কর ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে যারা দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ। এখন আইনি পদক্ষেপ নেয়ার আগেই জরিমানাসহ ফাঁকি দেয়া সব কর পরিশোধ করতে আয়কর বিভাগের কাছে অনেকে ধরনা দিচ্ছেন। আইন অনুযায়ী তাদের কর নথি পুনঃউন্মোচিত হবে। কর ফাঁকির জন্য ৩০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হবে। একই সঙ্গে চলবে কর মামলা। প্রয়োজনে ব্যাংক হিসাব জব্দ করেও আয়কর আইনে অর্থ আদায়ের সুযোগ আছে।

এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন সম্প্রতি বলেছেন, প্রাথমিকভাবে ৫০০ চিকিৎসককে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উপযুক্ত কর আদায় করেই তারা বসে থাকবেন না। নতুন নতুন তালিকা তৈরি করে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সবার কাছ থেকেই উপযুক্ত কর আদায়ের উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি জানান, শুধু ডাক্তারই নন, বিপুলসংখ্যক খ্যাতনামা আইনজীবী বিশাল অংকের কর ফাঁকি দেন। শিগগিরই তাদের তালিকাও তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে কর ফাঁকিতে সহায়তাকারী আয়করের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সিআইসি থেকে পাঠানো চিঠিতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্রোকারেজ হাউসকে এই বলে সতর্ক করা হয়েছে যে, উপযুক্ত কারণ ছাড়া ছক অনুযায়ী হিসাবধারীর পূর্ণাঙ্গ তথ্যাবলী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরবরাহ করা না হলে আয়কর অধ্যাদেশের ধারা ১২৪(২) অনুযায়ী এককালীন ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং পরবর্তীতে প্রতিদিনের জন্যে ৫০০ টাকা হারে জরিমানা আরোপ করা হবে। একই সঙ্গে ১৬৪ সিসি ধারায় অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড আরোপের লক্ষ্যে ফৌজদারি মামলা করা হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জে পাঠানো সিআইসির গোপনীয় পত্রে ২০০৭ সালের ১ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত সব ধরনের ব্যাংক হিসাব বিবরণী ৭ দিনের মধ্যে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। আয়কর অধ্যাদেশের ধারা ১১৩ (এফ) অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের একক বা যৌথ নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এফডিআর ও এসটিডিসহ যে কোনো মেয়াদি আমানতের হিসাব, যে কোনো ধরনের বা মেয়াদের সঞ্চয়ী হিসাব, চলতি হিসাব, ঋণ হিসাব, ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্ট, ক্রেডিট কার্ড বা ডেবিট কার্ড হিসাব, ভল্ট, সঞ্চয়পত্র বা যে কোনো সেভিংস ইন্সট্রুমেন্ট হিসাবসহ আগে ছিল কিন্তু বর্তমানে বন্ধ আছে এমন সব হিসাবের বিস্তারিত বিবরণী নির্দিষ্ট ছক অনুযায়ী পাঠাতে বলা হয়েছে।

সিআইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদেও দৈনন্দিন আয় অনুযায়ী বার্ষিক কর যা হওয়া উচিত তার ১০ শতাংশও দিচ্ছেন না। অনেকেই আবার উপযুক্ত করের ৫ থেকে ৭ শতাংশ দিয়েই দায় সারছেন। ফাঁকিবাজ এসব ডাক্তারের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট হারে কর আদায় করা গেলে সে অংক শত কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়ে যাবে। প্রশ্ন উঠেছে, আয়কর কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া বছরের পর বছর ধরে এভাবে কর ফাঁকি দেয়া সম্ভব কিনা। হাজার হাজার চিকিৎসক মাসে কয়েক লাখ টাকা আয় করলেও কর কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই তারা কর ফাঁকির সুযোগ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এনবিআরের চেয়ারম্যানের নির্দেশে গত মাসে প্রথমবারের নামিদামি চিকিৎসকের তালিকা করে সিআইসি। সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল থেকে এসব চিকিৎসকের নথি তলব করে তা পরীক্ষা করা হয়। এখনও শত শত কর নথি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এতে দেখা গেছে, অধিকাংশ চিকিৎসকই প্রকৃত আয় গোপন করছেন। তাদের ব্যাংক হিসাব, এফডিআর, জমি-ফ্ল্যাট আর বিভিন্ন বিনিয়োগ তথ্য পেয়ে চমকে উঠেছেন সিআইসির কর্মকর্তারা। যেসব চিকিৎসক কমপক্ষে ১ হাজার টাকা রোগীপ্রতি ফি নেন। তারা যদি দিনে কমপক্ষে ৩০ জন রোগী দেখেন তাহলেও রোগী ফি হিসেবে ৩০ হাজার টাকা আয় হওয়ার কথা। এরপর রয়েছে অন্যান্য আয় ও নানা কমিশনের অর্থ। কিন্তু এসব নামি চিকিৎসক যে আয় দেখাচ্ছেন তাতে তাদের প্রতিদিনের আয় ১ হাজার টাকারও কম বলে সূত্র দাবি করেছে।

সূত্রমতে, সিআইসি যাদের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি অধ্যাপক সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জি ও তার স্ত্রী দীবা ব্যানার্জি, ড. প্রজেশ কুমার রায় ও তার স্ত্রী মিসেস সুপ্রিতি রায়, গাইনি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আনোয়ারা বেগম ও তার স্বামী প্রফেসর হাবিবুর রহমান, ড. এসএম আমজাদ হোসেন ও তার স্ত্রী ড. খায়রুন্নাহার, মেডিসিনের প্রফেসর মনসুর হাবিব, নিউরো বিশেষজ্ঞ ড. কনককান্তি বড়ুয়া, পেডিয়াট্রিক চিকিৎসক সেলিম উজ্জামান, গাইনির অধ্যাপক শাহলা ফেরদৌস, ল্যাবএইডের কার্ডিওলজির প্রফেসর বরেন চক্রবর্তী, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সার্জারির অধ্যাপক এসএম আমজাদ হোসেন, শিশু হাসপাতালের ডা. রুহুল আমিন, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক প্রজেশ কুমার রায়, ডা. কামরুল হাসান তরফদার, বাংলাদেশ আই হাসপাতালের ডা. নিয়াজ আবদুর রহমান, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের প্রফেসর রওশন আরা বেগম, বারডেম জেনারেল হাসপাতালের ডা. নাজমুন্নাহার, প্রফেসর সাহাবুদ্দীন তালুকদার, ডা. সামস মনওয়ার, প্রফেসর শহিদ করীম, প্রফেসর সেলিম মো. জাহাঙ্গীর, লুৎফুল আজীজ, প্রফেসর আনিসুর রহমান, প্রফেসর শান্তনু চৌধুরী, প্রফেসর জিল্লুর রহমান, প্রফেসর মাহবুবুর রহমান, ডা. প্রদীপ রঞ্জন সাহা, ডা. জাহাঙ্গীর কবীর, প্রফেসর একেএম ফজলুল হক এবং ডা. অরুন কুমার শর্মা।