ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৬:০৪ ঢাকা, শনিবার  ২১শে এপ্রিল ২০১৮ ইং

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

আরো দুটি বিমান ঘাঁটি গড়ে তোলা হবে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে একটি অত্যাধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলায় তাঁর সরকারের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করে বলেছেন, বিমান বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধিতে শিগগিরই দেশে আরো দুটি বিমান ঘাঁটি গড়ে তোলা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত দিক থেকে অচিরেই জাতির পিতার কাক্সিক্ষত অত্যাধুনিক, পেশাদার ও চৌকস বিমান বাহিনী হিসেবে দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ্।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বরিশাল ও সিলেটে নতুন দুটি বিমান বাহিনী ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। আমার বিশ্বাস, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আরও শক্তিশালী হবে এবং এর সক্ষমতা বাড়বে।’

প্রধানমন্ত্রী আজ দুপুরে এখানে বিমান বাহিনী একাডেমিতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ৭৪ তম বাফা কোর্স ও ডিরেক্ট এন্ট্রি ২০১৭ কোর্সের কমিশন উপলক্ষ্যে আয়োজিত রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ-২০১৭ (শীতকালীন) অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি বিমান বাহিনীতে সংযোজিত কে-এইট ডব্লিউ জেট ট্রেনার, ওয়াই এ কে-১৩০ কমব্যাট ট্রেনার এবং এল-৪১০ ট্রান্সপোর্ট ট্রেনার এই বাহিনীর উড্ডয়ন প্রশিক্ষণকে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ করেছে।

তিনি বলেন, বিমান বাহিনী একাডেমির পুনর্গঠিত সাংগঠনিক কাঠামোরও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী বিমান বাহিনীর পাসিং আউট ক্যাডেটদের মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ করেন এবং একটি খোলা জিপে করে প্যারেড পরিদর্শন করেন।
তিনি অনুষ্ঠানে ক্যাডেটদের মধ্যে ট্রফি, সার্টিফিকেট এবং ফ্লাইং ব্যাজ বিতরণ করেন।

ফ্লাইট ক্যাডেট একাডেমী আন্ডার অফিসার আহম্মেদ মুসা কমান্ড্যান্ট হিসেবে প্যারেড পরিচালনা করেন। পরে বিমান বাহিনী এয়ারক্র্যাফটের মনোজ্ঞ ফ্লাইপাস্টও প্রত্যক্ষ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এরআগে প্রধানমন্ত্রী বিমান বাহিনী একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছলে বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার এবং বিমান বাহিনী একডেমীর কমান্ড্যান্ট এয়ার কমডোর এ এস এম ফখরুল ইসলাম তাঁকে স্বাগত জানান।

মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, সেনা ও নৌবাহিনী প্রধানগণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবগণ, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন মিশনের কূটনৈতিকবৃন্দ, অবসরপ্রাপ্ত বিমান বাহিনী প্রধানগণ, আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ এবং কমিশন প্রাপ্ত ক্যাডেটদের অভিভাবকবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বিমান বাহিনী ক্যাডেটদের দেশ ও জাতির আকাঙ্খা পূরণে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহবান জানিয়ে বলেন, বিমান বাহিনী একাডেমি থেকে যে মৌলিক প্রশিক্ষণ তোমরা গ্রহণ করেছ, কর্মজীবনে তার যথাযথ অনুশীলন ও প্রয়োগের জন্য সব সময় সচেষ্ট থাকবে। সততা, একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে।

তিনি বলেন, তোমরা নিজেদের এমনভাবে গড়ে তুলবে, যাতে তোমরা দেশ ও জাতির আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশিক্ষণ শেষ করার পর আজ থেকে শুরু হচ্ছে তোমাদের বৃহত্তর কর্মজীবন। প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষার গুরুদায়িত্ব পালনে আজ থেকে তোমরাও অংশীদার। আমি আশা করি, দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে এবং পবিত্র সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তোমরা বাংলার আকাশ মুক্ত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সঙ্কল্পবদ্ধ থাকবে।

শেখ হাসিনা ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর দক্ষতা অর্জনে ক্যাডেটদের সর্বদা সচেষ্ট থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, মনে রাখবে, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা আমাদের স্বাধীনতা পেয়েছি। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, তোমরা এ দেশেরই সন্তান। নিজেদের কখনই সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন ভাববে না। তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সব সময় চেষ্টা করবে।

তাঁর সরকারের সময়ে বিমান বাহিনীর অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমান বাহিনী একাডেমির জন্য আন্তর্জাতিক মানের ‘বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স’ নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এই কমপ্লেক্সের কাজ শেষ হলে বিমান বাহিনী একাডেমির কর্মপরিধি বৃদ্ধিসহ প্রশিক্ষণের মান আরও বাড়বে। তা ছাড়াও এই একাডেমির প্রশিক্ষণ আধুনিকায়ন ও ভবিষ্যত চাহিদা মেটানোর জন্য নতুন স্থাপনা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাঁর সরকার সচেষ্ট রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ সব উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী একাডেমি শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুনাম বয়ে আনতে সক্ষম হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মাত্র তিনটি বিমান নিয়ে যে বাহিনীর জন্ম, সে বাহিনী আজ অত্যাধুনিক বিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার, ক্ষেপনাস্ত্র, এমনকি বিমান রক্ষণাবেক্ষণে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ।

দেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রসংগ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- বঙ্গবন্ধু প্রণীত এই নীতির আলোকে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। আর্থ-সামাজিক খাতে আমরা দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছি। এই অর্জনকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।
তিনি দৃঢ় সংকল্প ব্যাক্ত করে বলেন, ইনশাআল্লাহ, সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

প্রধানমন্ত্রী পাসিং আউট ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজে পুরুষদের পাশাপাশি নারী ক্যাডেটদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে আমি সত্যিই আনন্দিত ও গর্বিত। তাদের এই কমিশনপ্রাপ্তি বর্তমান সরকারের নারীর ক্ষমতায়নের দৃঢ় নীতিরই প্রতিফলন। আমরা বিশ্বাস করি জাতীয় অগ্রগতিতে নারীর অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এজন্য সশস্ত্র বাহিনীতেও নারীদের ব্যাপকহারে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

প্রধানন্ত্রী স্বাধীন দেশের মান উপডেযাগী একটি বিমান বাহিনী গড়ে তোলায় জাতির পিতার উদ্যোগের কথা স্মরণ করে বলেন, স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি শক্তিশালী এবং প্রশিক্ষিত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার জন্য জাতির পিতা ১৯৭৪ সালে প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করেন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক কৌশলগত দিক বিবেচনায় রেখে তিনি একটি আধুনিক বিমান বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে সে সময়কার অত্যাধুনিক মিগ-২১ জঙ্গী বিমান, এমআই-৮ হেলিকপ্টার স্কোয়াড্রন, এএন-২৪ পরিবহন বিমান এবং রাডার বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সংযোজন করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫-এ জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর ১৯৯৬ সালে আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে কেউ কোন কার্যক্রম গ্রহণ করেনি।

তিনি বলেন, ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আমরা বিমান বাহিনীকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করার কার্যক্রম হাতে নিই। আমরা ২০০০ সালে বিমান বাহিনীতে ৪র্থ প্রজন্মের অত্যাধুনিক মিগ-২৯ জঙ্গী বিমান, বড় পরিসরের সি-১৩০ পরিবহন বিমান এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার সংযোজন করি। ২০০০ সালে আমরাই সর্বপ্রথম সশস্ত্র বাহিনীতে নারীদের কমিশন্ড অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া শুরু করি।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী সদস্যদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দেশ ও জাতির যে কোন প্রয়োজনে ভূমিকা রাখতে সদা প্রস্তুত থাকার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ-বিদেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা, উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে আমাদের বিমান বাহিনী অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর তাৎপর্যপূর্ণ অবদান বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন এবং স্বাধীনতার পর দেশ ও জাতির কল্যাণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এবছর বিমান বাহিনী স্বাধীনতা পদক পেয়েছে। বিমান বাহিনী দেশের এ সর্বোচ্চ পদক অর্জন করায় তিনি বিমান বাহিনীর সকল সদস্যের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন জানান।

রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ- ২০১৭-এ ৭৪ তম বাফা কোর্সের ৬৮ জন ফ্লাইট ক্যাডেট এবং ডিরেক্ট এন্ট্রি ২০১৭ কোর্সের ১১ জনসহ মোট ৭৯ জন কমিশন লাভ করেছেন। এদের মধ্যে ১৩ জন মহিলা ক্যাডেটও কমিশন লাভ করেন। ফ্লাইট ক্যাডেট মীর্জা মো. জুবায়ের হোসেন ৭৪ তম ফ্লাইট ক্যাডেট কোর্সে সেরা চৌকস কৃতিত্বের জন্য ‘সোর্ড অব অনার’ এবং ফ্লাইট ক্যাডেট শাহরিয়ার তানজীম জেনারেল সার্ভিস প্রশিক্ষণ কৃতিত্বের জন্য ‘কমান্ড্যান্টস ট্রফি’ লাভ করেন। উড্ডয়ন প্রশিক্ষণে সেরা কৃতিত্বের জন্য ফ্লাইট ক্যাডেট মীর্জা মো. জুবায়ের হোসেন বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ট্রফিও লাভ করেন। ফ্লাইট ক্যাডেট গ্রাউন্ড ব্রাঞ্চে সেরা কৃতিত্বের জন্য ফ্লাইট ক্যাডেট এফ এম শহীদুল ইসলাম সুজন ‘বিমান বাহিনী প্রধান’ ট্রফি লাভ করেন। এছাড়াও সার্বিকভাবে বিমান বাহিনী একাডেমী’র ১ নং স্কোয়াড্রন চ্যাম্পিয়ন বিবেচিত হয়ে একাডেমী পতাকা লাভ করে।

এই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে নৌবাহিনীর দু’জন পাইলট এবং বিমান বাহিনীর দুজন মহিলা পাইলটকে ফ্লাইং ব্যাজ পরিয়ে দেন।