Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৯:২১ ঢাকা, বুধবার  ১৪ই নভেম্বর ২০১৮ ইং

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

আমার সফরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুদৃঢ় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বলেছেন, তাঁর সাম্প্রতিক ভারত সফরের মধ্যদিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি এই সফরের মধ্য দিয়ে দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শান্তিনিকেতনে স্থাপিত বাংলাদেশ ভবন উভয় দেশের মধ্যে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিকেলে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন।

শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে গত ২৫ ও ২৬-এ মে পশ্চিমবঙ্গ সফর করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর একান্ত বৈঠক হয়। এ সময় উভয়ে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনসহ স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে স্থাপিত বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন। একইসঙ্গে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান আসানসোলে অবস্থিত ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’ জাতীয় কবির ১১৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ সমাবর্তনে তাঁকে ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করে। প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে সেখানে উপস্থিত হয়ে সম্মাননা গ্রহণ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা, মন্ত্রী পরিষদের কয়েকজন সদস্যসহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সঙ্গে ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর সফরের বিস্তরিত বর্ননা করে বলেন, ২৫-এ মে সকালে ঢাকা থেকে রওয়ানা হয়ে তিনি কলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বিমানবন্দরে পৌঁছালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নগর ও পূর উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।

এরপর তিনি বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে করে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছান। সেখানকার রবীন্দ্র ভবনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁকে স্বাগত জানান। সমাবর্তনে রবীন্দ্র ভারতীর আচার্য ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর কেশরীনাথ ত্রিপাঠী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাবর্তন উদ্বোধন শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যৌথভাবে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নবনির্মিত ‘বাংলাদেশ ভবন’-এর উদ্বোধন করেন। এ সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও উপস্থিত ছিলেন।

শেখ হাসিনা এ সময় সেখানে বাংলাদেশ ভবন নির্মাণের ইতিবৃত্ত তুলে ধরে বলেন, কবিগুরুর শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয় ২০১০ সালে তাঁর ভারত সফরের সময়। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর বাংলাদেশ সফরকালে ঘোষিত যৌথ ইশতেহারে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ ভবন’ নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হয়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় এ বিষয়ে ঘোষণা প্রদান করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থাপত্য অধিদপ্তর যৌথভাবে দৃষ্টিনন্দন এই ভবনটি নির্মাণ করেছে।

তিনি বলেন, ভবনটির নির্মাণে প্রায় ২৫ কোটি ভারতীয় রুপি ব্যয় হয়েছে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলাদেশ ভবন’-এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে ১০ কোটি ভারতীয় রুপির একটি স্থায়ী তহবিল গঠন করা হবে। এই তহবিলের অর্জিত লভ্যাংশ হতে প্রতিবছর বাংলাদেশের দশজন শিক্ষার্থীকে এম.ফিল ও পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য ফেলোশিপ প্রদান করা হবে।

‘এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক গত ২৫-এ মে স্বাক্ষরিত হয়, ’বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদী শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবন প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক বর্তমানে ‘সোনালী অধ্যায়’ অতিক্রম করছে।

তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনেতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এই ভবন উভয় দেশের মধ্যকার সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রী মোদী বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণের জন্য বাংলাদেশের জনগণকে সাধুবাদ জানান। ভবিষ্যতে উভয় দেশের মধ্যে মহাকাশ প্রযুক্তির উন্নয়নে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নত দেশ হিসেবে পরিণত হওয়ার আকাক্সক্ষায় ভারত অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে এবং সব ধরণের সহযোগিতা করবে।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় শান্তি নিকেতনের বাংলাদেশ ভবনে তাঁর প্রদত্ত ভাষণের উল্লেখ করে বলেন, ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবন স্থাপনের সুযোগ প্রদানের জন্য আমি ভারত সরকার, সে দেশের জনগণ এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশেরই সম্পদ উল্লেখ করে তিনি দু’দেশের সংস্কৃতি এবং জনমানসে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব অপরিসীম বলে উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় দেশেরই জাতীয় সংগীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের পতিসর, শিলাইদহ আর শাহজাদপুরে কাটিয়েছিলেন। এজন্য তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে ১৯৯৯ সালে বিশ্বভারতী কতৃর্ক তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘দেশিকোত্তম’ প্রদানের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের জনগণের অপরিসীম আত্মত্যাগের বিষয়টি স্মরণ করেন এবং মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্যও ভারত সরকারের অধিকতর সহযোগিতা কামনা করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এর আগে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার একান্ত বৈঠক হয়। এ সময় আমরা দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনসহ স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি।’

শান্তিনিকেতন থেকে ফিরে বিকেলে প্রধানমন্ত্রী কবিগুরুর স্মৃতিধন্য জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি পরিদর্শন করেন।

ঐদিন সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এলে তিনি বাংলাদেশের ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশের চিত্র তুলে তাঁদেরকে বাংলাদেশে অধিকতর বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

সন্ধ্যায় রাজভবনে পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর কেশরীনাথ ত্রিপাঠী আয়োজিত নৈশভোজে যোগদান করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের আসানসোল সফরের উল্লেখ করে বলেন, ২৬-এ মে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে অবস্থিত কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (ডি.লিট) ডিগ্রি গ্রহণ করেন এবং সমগ্র বাঙালি জাতির উদ্দেশ্যে এটি উৎসর্গ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কবি নজরুল প্রবন্ধ, কবিতা, গান, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ইত্যাদির পাশাপাশি হামদ/নাত এবং শ্যামা সঙ্গীত/বৈষ্ণব কীর্তন রচনা করেছিলেন। নজরুলের জন্ম পশ্চিমবঙ্গে হলেও, তাঁর জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে বাংলাদেশে। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুরসহ নানা জায়গায় অবস্থান করেছেন। কাজেই উভয় বাংলার সংস্কৃতিতে নজরুলের প্রভাব প্রবলভাবে বিদ্যমান।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় নজরুলকে জাতির পিতার স্বাধীন দেশে নিয়ে আসাসহ নাগরিকত্ব এবং জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদানের উদ্যোগ তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের রনসঙ্গীত ‘চল চল চল-যেমন কবির লেখা তেমনি আমাদের অমিত প্রেরণার উৎস জয়বাংলা শ্লোগানটি পর্যন্ত নজরুলের কবিতর পংক্তিমালা উৎসারিত বলেন, প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসানসোল থেকে ফিরে ঐদিন বিকেলে তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কিংবদন্তী নেতা নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর স্মৃতিবিজড়িত নেতাজী মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন।

তিনি বলেন, ভারতীয় লোকসভার সদস্য সুগত বসু এবং প্রাক্তন লোকসভা সদস্য কৃষ্ণা বসু মিউজিয়ামের উল্লেখযোগ্য নিদর্শনসমূহ ঘুরিয়ে দেখান এবং নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্মদিন উপলক্ষে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর একটি অডিও বাণীর ডিজিটাল কপি প্রদান করেন। ১৯৭২ সালের ২৩-এ জানুয়ারি জাতির পিতা নেতাজীর উদ্দেশ্যে এই বাণীটি পাঠিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ঐদিন সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে তাঁর কলকাতায় অবস্থানকালীন হোটেল তাজ বেঙ্গলে বৈঠক হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। এরপর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে নির্বাচিত লোকসভা ও বিধানসভার কয়েকজন সদস্য আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

সেই রাতেই ভারতে তাঁর দু’দিনের সরকারী সফর শেষে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় ফেরেন প্রধানমন্ত্রী।