ব্রেকিং নিউজ

সন্ধ্যা ৬:৫৬ ঢাকা, রবিবার  ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০১৭’ উপলক্ষে উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণ দেন।

আমাদের শত্রু বাইরে না, ঘরের শত্রুই বিভীষণ – প্রধানমন্ত্রী

দেশের অগ্রগতি বাধাগ্রস্থ তথা দেশের ক্ষতি করতে একটি মহল জড়িত বা ক্ষতির চেষ্টা চালাচ্ছে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাদের শত্রু বাইরে না। ঘরের শত্রুই বিভীষণ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে তার তেজগাওস্থ কার্যালয়ে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০১৭’ উপলক্ষে উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণ আমাদের সাথে আছে, জনগণের শক্তিই আমাদের মূল শক্তি। সুতরাং আপনাদের ওপর জনগণের আস্থাকে বাড়াতে হবে এবং যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশেষ করে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরো অধিক জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘জনগণ চাইলেই দেখাতে পারে কে কি কাজ করে এবং তাদের কাছ থেকেই সঠিক তথ্যটা পাওয়া যায়।’

বাংলাদেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে বহিঃবিশ্বে এবং দেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র চলছে উল্লেখ করে প্রধনমন্ত্রী এই ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় পুলিশ বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্র্দেশ দেন।

রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগী সংস্থাগুলোর সার্বিক উন্নয়নে তার সরকার কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় তার জঙ্গিবাদ বিরোধী জিরো টলারেন্স নীতির পুনরোল্লেখ করে বলেন, জঙ্গিবাদ যেন আবার মাথাচারা দিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য পুলিশের জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের মাঝে একটা সচেতনতা সৃষ্টি করতে পেরেছি। জনগণকে এসব কাজের সাথে আরো সম্পৃক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, জঙ্গিরা মিথ্যা কথা বলে, ধর্মের অপব্যাখা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। কোমলমতি শিশুদের এখান থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। আইন শৃঙ্খলা যেন সুন্দর থাকে সেটা দেখতে হবে।

বিএনপি-জমায়াতের শাসনামলে দেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা নিজেরাই একটু স্মরণ করে দেখেন, এই জঙ্গি-সন্ত্রাসি, এদেরকে তো তারা (বিএনপি-জামায়াত) মদদ দিত, উস্কে দিত।

২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালেও বিএনপি-জামায়াত যে সমস্ত ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে- যার ভেতরে এতটুকু মনুষত্ব আছে সে কিভাবে একজন মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে, এই পুলিশকে কিভাবে মাটিতে ফেলে পিটিয়ে হত্যা করা হলো বা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হলো ? প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, যারা দেশের কল্যাণ চিন্তা করে তারা কখনো ধ্বংসাত্মক কাজ করতে পারে না।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্র সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ, আইজিপি একেএম শহীদুল হক এবং অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) মো. মোখলেসুর রহমান বক্তৃতা করেন।

এ ছাড়াও মহানগর পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম এবং অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান এবং গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুনুর রশীদ বক্তৃতা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, হলি আর্টিজানের ঘটনার পর কোন এক দেশের রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য ছিলো এই ঘটনা বাংলাদেশ সামাল দিতে পারবে না। এই বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সে একটি স্টেটাস দিয়েছিলো। কিন্তু আমরা সেটা পারলাম কয়েক ঘন্টার মধ্যে। তাতে মনে হলো কেউ কেউ খুশি হতে পারলো না।

তিনি বলেন, এরকম হবে আমরা তাদের কাছে আকুতি করবো, অমুকের কাছে চাইবো, এটা চাইবো, সেটা চাইব। কিন্তুু আমরা বাঙালিরা যে পারি, এখনো তারা চিনতে পারেনি।

হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলা মোকাবেলায় পুলিশের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই জন পুলিশ জীবন দিয়ে গেছেন, কিন্তু তারা অনেকগুলো মানুষকে বাঁচিয়ে গেছেন, দেশের সম্মান বাঁচিয়ে গেছেন।

‘এটা হচ্ছে কর্তব্যবোধ, যে আপনারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দায়িত্ব পালন করেছেন’, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

সন্ত্রাস ও জঙ্গিদমনকে বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বৈশ্বিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অনেক দেশই এখানে হিমসীম খাচ্ছে। বাংলাদেশ এটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। কোনভাবেই আমরা বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হতে দিবো না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এই ধরনের চ্যালেঞ্জ আরো মোকাবেলা করতে হবে। আমার সব সময় চিন্তা হয়, যখনই বাংলাদেশর মানুষ ভালো থাকে, স্বস্তিতে থাকে, উন্নতি হয় তখনই যেন ষড়যন্ত্র আরো বেশি শুরু হয়।

তিনি পচাত্তরের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, ১৫ আগস্ট যখন ঘটেছিলো তখন বাংলাদেশ খাদ্যভাব ছিলো না, সব কিছু মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে এসেছিলো। তখন প্রবৃদ্ধি ৭ ভাগের বেশি হয়। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ এগিয়ে যাবে এটা অনেকে ভাবতেই পারেনি। ঠিক তখনই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিলো।

শেখ হাসিনা সব সময়য় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এখনো আমরা উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। হ্যা আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাংলাদেশ প্রশংসিত হচ্ছে। কিন্তু ঐ প্রশংসা শুনে মন গলা এটা আমার স্বভাব না। সেখানে সন্দেহের কিছু আছে কি না এটা আমাদের দেখতে হবে।

‘দেশ এভাবে এগিয়ে যাবে এটা অনেকে নিতে পারে না। আমাদের শত্রু বাইরে না। ঘরের শত্রুই বিভীষণ। কিভাবে দেশের ক্ষতি করবে সেই চিন্তাতেই তারা থাকে,’ উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

’৭৫ পরবর্র্তী শাসকেরা ক্ষমতাকে ভোগের বস্তুতে পরিণত করেছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের কাছে ক্ষমতাটাই ছিল সব। দেশ গোল্লায় যাক। ক্ষমতাকে ভোগ দখল করেছিলো, তাদের বিত্ত বৈভব তৈরি করার একটা স্থান করে নিয়েছিলো। দেশের মানুষের দিকে ফিরে তাকায়নি।

তখন ক্ষমতা জনগণের হাতে নয় বরং ক্যান্টনমেন্টে চলে গিয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মানুষের সার্বিক উন্নতি হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জনসেবার মনোভাব নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করি। রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা আমাদের সহযোগী তারা যেন সুন্দর পরিবেশ পায়, স্ব স্ব দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারে সেই চেষ্টাটা করছি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের যত দরদ, উড়ে এসে যারা ক্ষমতায় আসে তাদের সেটা থাকবে না। তারা ক্ষমতায় আসে ভোগ করতে।’

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে গাইবান্ধায় সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটনের হত্যা প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেলে গাইবান্দায় আমাদের এক সংসদ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐ সাংসদের বাসায় প্রহরারত পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। কেন পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়া হলো ? তার বিরুদ্ধে একটা অপবাদ দিয়ে তার লাইসেন্স করা অস্ত্র তার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হলো।

‘মনে হলো একেবারে পরিকল্পিতভাবে ছেলেটাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হলো,’ বলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাইবান্দার সুন্দরগঞ্জ, পলাশবাড়ি, গোবিন্দগঞ্জ থেকে শুরু করে সাঘাটা এ সমস্ত এলাকায় ২০১৩ সালে চারজন পুলিশকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো। পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেয়া হয়েছিল, রেলের ফিসপ্লেট খুলে ফেলা হয়েছিলো।

তিনি বলেন, সেখানকার একজন সংসদ সদস্যের নিরাপত্তার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে, কোন পত্রিকায় কি লিখলো সেটা সঠিক খবর কিনা না জেনেই কেন এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হলো। যার জন্য একজন সংসদ সদস্যকে জীবন দিতে হলো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। সেখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধিকে এভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে। এটা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি এলাকায় এ ব্যাপারে সর্তক থাকবে হবে।

প্রধানমন্ত্রী মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ছোট খাটো ঘটনা হলেই দেখি হাউকাউ শুরু হয়ে যায়। একজন সংসদ সদস্যকে হত্যা করার পর কোন মানবাধিকার সংগঠন বা কেউ এ ব্যাপারে কোন শব্দ করল না। বাংলাদেশ একটা অদ্ভুত দেশ দেখি।

প্রধানমন্ত্রী এক শ্রেণীর মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি বিষোদগার করে বলেন, যারা পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে হত্যা করলো, মসজিদে আগুন দিলো, মানুষ পোড়ালো তাদের বিরুদ্ধে এদের অত বেশি সোচ্চার হতে দেখি না।

তিনি বলেন, এটাও ষড়যন্ত্রের অংশ। প্রতিটি এলাকায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে, আস্থায় রাখতে হবে। তাদের নিয়ে সকল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।

বক্তব্যের শুরুতে ’৬৯র ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবসের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং পাকিস্তান আমলের বৈষম্যের একটি চিত্র তুলে ধরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহান আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।