Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

রাত ৯:১১ ঢাকা, মঙ্গলবার  ২০শে নভেম্বর ২০১৮ ইং

আমাদের মাতৃভাষার স্বকীয়তাও রক্ষা করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

pm42প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে আরো সচেতন হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে স্বীকৃত যে ভাষা সেটাকেই পর্যায়ক্রমে গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু আমাদের মাতৃভাষার স্বকীয়তাও রক্ষা করতে হবে।’
মাতৃভাষা শিক্ষা নেয়ার পর অন্য ভাষা শিখলেই প্রকৃত শিক্ষাটা হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কাজেই এ বিষয়ে আমাদের সমাজকে আমি আরো একটু সচেতন হওয়ার আহবান জানাচ্ছি। আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা যেটা এত রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি সেটা যেন ধারণ করতে পারি।’
তিনি একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে আহবান জানিয়ে বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি যে ইতিহাস সেটা আমরা বিশ্বব্যাপী তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছি। এ বিষয়ে আমি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করবো আরো কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করতে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে একুশে পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সভাপতিত্বে এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলমের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব আকতারী মমতাজ।
pm45

স্ব স্ব ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর ১৬ জনকে প্রধানমন্ত্রী একুশে পদক প্রদান করেন। পদকপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পদকপ্রাপ্তির সাইটেশন পাঠ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম।
ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদানের জন্য বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, ডা. সাঈদ হায়দার, ড. জসীম উদ্দিন আহমেদকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই বিভাগে মরহুম সৈয়দ গোলাম কিবরিয়ার (মরণোত্তর) পুরস্কার গ্রহণ করেন তার জ্যেষ্ঠ সন্তান মিসেস রোকেয়া বেগম।
শিল্পকলায় গৌরবজনক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অভিনেত্রী নাট্যকার ও প্রযোজক বেগম জাহানারা আহমেদ, শাস্ত্রীয় সংগীতে উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পী পন্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী, সংগীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী বেগম শাহীন সামাদ, নৃত্যে নৃত্যনাট্যকার আমানুল হককে একুশে পদক প্রদান করা হয়। চিত্রকলায় শিল্পী মরহুম কাজী আনোয়ার হোসেনের (মরণোত্তর) পক্ষে সহধর্মিনী মিসেস সুফিয়া আনোয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি মফিদুল হক, সাংবাদিকতায় বিশিষ্ট সাংবাদিক দৈনিক জনকন্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত পিন্ডীর প্রলাপের ¯্রষ্টা ও বঙ্গবন্ধুর সাবেক প্রেস সচিব তোয়াব খানকে এ বছর একুশে পদক প্রদান করা হয়।
pm44

গবেষণায় অধ্যাপক ড. এ বি এম আব্দুল্লাহ এবং লেখক ও নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি মংছেন চীং মংছিনকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
ভাষা ও সাহিত্যে গৌরবজনক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কথাশিল্পী জ্যোতি প্রকাশ দত্ত, অধ্যাপক ড. হায়াৎ মামুদ এবং কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজীকে এ বছর একুশে পদক প্রদান করা হয়।
পদকপ্রাপ্তদের ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের তৈরি ৩৫ গ্রাম ওজনের একটি পদক, দুই লাখ টাকা, একটি সম্মাননাপত্র এবং একটি রেপ্লিকা প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর-অধিদপ্তর এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশনের সদস্যবৃন্দ এবং উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কমৃকর্তাবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিনিয়ত মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী চেতনায় মাতৃভাষাকে ধারণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের প্রয়োজনে। মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে সবার সঙ্গে কথা বলতে অন্য ভাষাকে বেছে নিচ্ছে। কিন্তু মাতৃভাষাকে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের যেমন অন্য ভাষায় শিক্ষা নিতে হবে তেমনি নিজেদের মাতৃভাষাতেও চর্চা করতে হবে। কারণ নিজেদের মাতৃভাষা ছাড়া প্রকৃত শিক্ষা হয় না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আমাদের ওপর বিরাট দায়িত্ব, সারাবিশ্বে যত মাতৃভাষা আছে তা সংরক্ষণ ও গবেষণার। ইতোমধ্যেই আমরা একটা মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গঠন করেছি। সেখানে বিভিন্ন মাতৃভাষাগুলোকে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, গবেষণা করা হচ্ছে। সেটাও ইউনেস্কোর ক্যাটাগরি-২ তে উন্নীত হয়েছে সেখানেও বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা এবং ভাষা শহীদরা মর্যাদা পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত সাত বছরে সরকারের সাফল্য তুলে ধরে বলেন, ‘গত সাত বছরে দেশকে একটি মর্যাদার আসনে এনে দিতে পেরেছি, দেশের মানুষের ভেতর মর্যাদাবোধ তৈরি হয়েছে, এটাই আমাদের বড় অর্জন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের মানুষের মধ্যে মর্যাদাবোধ ফিরিয়ে আনতে পেরেছি, তাদের আত্মবিশ্বাসও ফিরে এসেছে। আমরা এখন মাথা উঁচু করে চলতে পারি। এ সবই একুশ আমাদের শিখিয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে ‘৪৮ এর ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব থেকে শুরু করে ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত অবস্থায় জাতির পিতার বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ, ’৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারিতে সালাম, বরকত, রফিকদের মহান আত্মত্যাগ এবং তারই ধারাবাহিকতায় একাত্তরের সশ¯্র সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরেন।
আমাদের সকল অর্জনই ত্যাগের মাধ্যমেই অর্জিত বলেও প্রধানমন্ত্রী এ সময় মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে অমর একুশে ফেব্রুয়ারীকে স্বীকৃতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, ‘কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম, আবদুস সালামের মত প্রবাসী বাঙালিদের প্রচেষ্টায় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আন্তরিক উদ্যোগে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১ ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।’
তিনি বলেন, ‘কানাডা প্রবাসী রফিক ও সালাম, আপনাদের মনে আছে ভাষা আন্দোলনেও রক্ত দিয়েছিল রফিক ও সালামরা। তারা একটা সংগঠনের মাধ্যমে জাতিসংঘে প্রস্তাব পাঠালে (জাতিসংঘ) আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। …মাত্র ২৪ ঘন্টারও কম সময়ে নিয়মানুযায়ী সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে আমরা প্রস্তাব পাঠাই। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসের ইউনেস্কো সম্মেলনে ভোটের মাধ্যমে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়।’
একুশে পদকপ্রাপ্তদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আশা করি আপনাদের মাধ্যমে দেশের মর্যাদা আরও বাড়বে। ভবিষ্যত প্রজন্ম উজ্জীবিত হবে।’
তিনি বলেন, দেশে আজ অনেকেই আছেন যাদের আমরা মূল্যায়ন করতে পারছি না। তাদের ও আপনাদের মূল্যায়ন এই পুরস্কারের মধ্যদিয়ে হয় না। তবে, আমরা শুরু করেছি। আমরা চাই আপনাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম সঠিক পথে চলতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পুরস্কার বড় কিছু না, আপনাদের অর্জন তার চাইতে অনেক বড়।’
প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই পাঁচ কোটি লোককে নিন্মআয় থেকে নিন্ম-মধ্যম আয়ে তুলে আনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি। আমরা বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলতে চাই। আমরা নিন্ম-মধ্যম আয়ে থাকতে চাই না। ২০২১ সালের আগেই মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে চাই। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত করে উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
২০৪১ সালে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি সমৃদ্ধশালী উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের পরিবেশনায় জাতীয় সংগীত এবং শহীদ আলতাফ মাহমুদের সুরারোপিত এবং আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত অমর একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্ষে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ পরিবেশিত হলে সকলেই দাাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন।