Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

রাত ৩:২৬ ঢাকা, সোমবার  ১৯শে নভেম্বর ২০১৮ ইং

ফাইল ফটো

“আমরা উন্নত অর্থনীতিতে যেতে চাই”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে থাকতে চাই না, আমরা উন্নত অর্থনীতিতে যেতে চাই।
বুধবার বাংলাদেশ নিম্নআয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য আনীত প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। সরকারি দলের সদস্য মো. আব্দুর রাজ্জাক ১৪৭ বিধিতে প্রস্তাবটি উত্থাপন করলে এর ওপর আলোচনা শেষে সর্বসম্মতভাবে ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর তিনি যখন কারাবন্দী ছিলেন, পরবর্তীতে দেশের দায়িত্বে এলে কিভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন তার পরিকল্পনা তখনই করেন। সে অনুযায়ী ২০০৯ সালে তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করেন। সে সময়ই রূপকল্প-২০২১ প্রণয়ন করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকী ও ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের সময়ে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চাই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। এজন্য যে ধন্যবাদ প্রস্তাব আনা হয়েছে, এ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য বাংলাদেশের জনগণ। এদেশের জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছি বলেই বাংলাদেশকে আমরা এ পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন হয়েছে। জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছেন এ দেশের দুঃখী মানুষের হাসি ফোটানোর জন্য। যে দেশের মানুষ দু’বেলা পেট ভরে খেতে পারতো না, যাদের গায়ে পড়ার মতো কাপড় ছিল না, যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, ঘরে চাল ছিল না, পানি পড়ত, অসুখে রোগে-ভুগে মায়ের কোলে শিশু মারা যেত বিনা চিকিৎসায় ওষুধের অভাবে। রাস্তা-ঘাট ছিল না। বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দায়িত্ব নেন। তাঁর জীবনের একটাই লক্ষ্য ছিল, এ দুঃখী মানুষের হাসি ফোটানো এবং মানুষকে একটি সুন্দর জীবন দেয়া।
শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু যখন দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। ২১ বছর দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা থেমেছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে দুর্ভিক্ষের, দুর্যোগের, ঘূর্ণিঝড়ের, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, সাহায্য ও ভিক্ষা চেয়ে চলার দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। এসব দেখে দুঃখ হতো। যে দেশ লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন করেছি। সেদেশ বিশ্ব সভায় মাথা উঁচু করে চলবে বিজয়ী জাতি হিসেবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্র এ দেশ আরো উন্নত হবে, এটাই সকলের কাক্সিক্ষত ছিল।
তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকে জাতির পিতার দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে দেশের মানুষের জন্য তিনি কি করতে চেয়েছিলেন, এটা নিয়ে ভাবতাম। তিনি দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। দেশ কোথায় যাচ্ছে। যেহেতু বড় সন্তান ছিলাম, সেহেতু পিতার পাশে থেকে তাঁর কাছ থেকে এদেশের মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনতাম এবং কিভাবে দেশের মানুষের দুঃখ দূর করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করতাম বলেই সব সময় মনে একটা পরিকল্পনা ছিল। যদি কখনও দেশ সেবার সুযোগ পায় তাহলে দেশ কিভাবে উন্নত করা যায় তা নিয়ে ভাবতাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৯৬ সালে সরকার গঠনের পর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। অবকাঠামো উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ৫ বছর সময় চলে যায়, দেশ আবার অমানিশার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। দুর্নীতি, হত্যা, খুন, লুণ্ঠন, অর্থ পাচার, দুঃশাসন ও অব্যবস্থাপনা আবারও দেশকে গ্রাস করে।
আলোচনায় আরো অংশ নেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, সরকারি দলের সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, অধ্যাপক আলী আশরাফ, আব্দুল মান্নান, ডা. দীপু মনি, মো. আব্দুস শহীদ, মাহবুবুল আলম হানিফ, আব্দুল মতিন খসরু, ড. হাছান মাহমুদ, মোহাম্মদ ফারুক খান, আ খ ম জাহাঙ্গীর, তাজুল ইসলাম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, শেখ ফজলে নুর তাপস, নুরুল ইসলাম সুজন, নজরুল ইসলাম বাবু, এডভোকেট তারানা হালিম, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, নুরুজ্জামান আহমেদ, বেগম ওয়াসিকা আয়শা খান, আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী, জাতীয় পার্টির সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ, ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান, বেগম মাহজাবিন মোরশেদ, জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদল, ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, তরিকত ফেডারেশনের সদস্য নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী ও স্বতন্ত্র সদস্য রস্তম আলী ফরাজী।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আর কোন অপতৎপরতাই এ অগ্রযাত্রা থামাতে পারবে না।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে চলেছে। সাম্প্রতিক এ অর্জন তারই স্বীকৃতিস্বরূপ। এই ধারা অব্যাহত রেখে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে চলে আসবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা নির্মাণে যে কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিলো তারই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে চলেছে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া কোনদিনই অর্থনীতির এমন অভাবনীয় সাফল্য অর্জন সম্ভব হতো না। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, দেশ স্বাধীনের পর বিশ্বব্যাংক বলেছিল, দেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও বিদেশী সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে। তাদের সেই কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে আজ আমরা আর বিদেশী সাহায্যের উপর নির্ভরশীল দেশ নয়।
তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশকে আত্মনির্ভরশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সেই আকাক্সক্ষা পূরণে আত্মপ্রত্যয়ের সাথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ আজ আত্মমর্যাদাবান দেশ। অতি শিগগিরই বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে।
কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাংক স্বীকৃতি দিলেই কি, না দিলেই কি। হাতের চুড়ি আয়নায় দেখতে হয় না। এই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণে কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল। তারা কৃষিতে ভর্তুকি দেয়ার বিরোধিতা করেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষিতে ভর্তুকিকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখার ফলে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। দেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করায় প্রধানমন্ত্রীকে তিনি ধন্যবাদ জানান।
অন্যান্য সংসদ সদস্যরা বলেন, বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, এ বছর থেকে বাংলাদেশ নিম্নআয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পদ্ধতি অনুযায়ী, মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৪৬ মার্কিন ডলার থেকে শুরু করে ৪ হাজার ১২৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হলে তা নিম্নমধ্যম আয়ের এবং ৪ হাজার ১২৬ ডলার থেকে শুরু করে ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার হলে ওই আয়ের দেশগুলো মধ্যম আয়ের দেশ বলা হয়। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় গত তিন বছর ধরে বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ১ হাজার ৪৫ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত রিপোর্টে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উন্নয়নের এ ধারা অব্যহত থাকলে আগামী ৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ জাতিসংঘের মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর হবে।
তারা বলেন, শুধু জাতীয় আয় নয়, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে পৃথিবীর অগ্রগামী ২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এমডিজি’র শেষ বছর ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের দারিদ্র অর্ধেকে নামিয়ে শতকরা ২৮ ভাগে আনার কথা ছিল। ইতোমধ্যে এ বছর তা ২৩.৫ ভাগে আনা সম্ভব হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী শিক্ষাসহ প্রতিটি সামাজিক সূচকে আশানুরূপ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
সংসদ সদস্যরা বলেন, বিশ্বব্যাংকের এই স্বীকৃতি বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ একটি সম্মানজনক অবস্থান করে নিয়েছে।
তারা বলেন, বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তোরণে জাতিসংঘ মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানব সম্পদের অবস্থান ও অর্থনীতির ঝুঁকিগ্রস্ততা এই তিনটি সূচক বিবেচনা করে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অর্থনীতির ঝুঁকিগ্রস্ততা সূচকে নির্ধারিত মাপকাঠি অর্জন করেছে। মানব সম্পদ উন্নয়নে (৬৩.৮) মাত্র ২.২ পয়েন্ট পিছিয়ে আছে। মাথাপিছু আয় (আটলাস পদ্ধতি) খুব কাছাকাছি। উন্নয়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর হবে।