ব্রেকিং নিউজ

ভোর ৫:২২ ঢাকা, বুধবার  ১৭ই জানুয়ারি ২০১৮ ইং

ফাইল ফটো

আজ পবিত্র হজ

লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক অর্থাৎ আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির। সারা বিশ্বের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কণ্ঠে মুহুর্মুহু ধ্বনিতে আজ বুধবার মুখরিত হয়ে উঠবে ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দান। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে সৌদি আরবে আরবি জিলহজ মাসের ৯ তারিখ অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র হজের মূল অনুষ্ঠান। হাদিসের বিধান অনুযায়ী মঙ্গলবার মিনার তাঁবুতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় এবং রাত যাপন করবেন হাজীরা। এর পর হাজীরা আজ বুধবার ফজরের নামাজ আদায় করেই আরাফাতের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। তাদের সবার মুখে থাকবে লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান নিমাতা, লাকাওয়াল মুলক অর্থাৎ আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার।
বিশ্বের প্রায় ১৯০টি দেশের ৩০ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান হজের আনুষ্ঠানিকতা পালনের উদ্দেশে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পবিত্র মক্কা নগরী থেকে মিনার তাঁবুতে এসে নামাজ আদায়, ইবাদত-বন্দেগি ও জিকির-আজকার করেছেন। প্রতি বছরের মতো এবারও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হাজার হাজার সুদৃশ্যমান সাদা রঙের তাঁবুতে সুশৃংখলভাবে অবস্থান করেছেন হাজীরা। ফজর নামাজ শেষে কেউ পায়ে হেঁটে, আবার কেউ বিভিন্ন যানবাহনে করে হাজির হন ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দানে। এবার বাংলাদেশ থেকেও গেছেন এক লাখ ৬ হাজার মুসল্লি।
পবিত্র মক্কা নগরী থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে হজরত আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলনের ঐতিহাসিক স্থান এই আরাফাত। আরাফাত ময়দানের জাবালে রহমত হচ্ছে পুনর্মিলনের স্মৃতিস্তম্ভ। যেখানে হাজীরা সমবেত হয়ে চুম্বন এবং মোনাজাত করে থাকেন। শুধু তাই নয়, মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর বিদায় হজের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি আরাফাত ময়দানের আকাশ-বাতাস ও প্রতিটি বালুকণায় প্রতিধ্বনিত হয় হাজীদের হৃদয়মথিত লাব্বাইক ধ্বনি। চারদিকে শুধুই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শানে হাজির হওয়া দুই প্রস্থ সাদা কাপড় পরা লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ। পবিত্র হাদিস শরিফের বর্ণনা মতে, হজের তিনটি ফরজের মধ্যে আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আরাফাতে অবস্থান ছাড়া হজ পরিপূর্ণ হয় না। হাজীরা কেউ তাঁবু টানিয়ে, কেউ কেউ সরকারি হজক্যাম্পে আবার অধিকাংশই খোলা আকাশের নিচে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এক কাতারে মিলিত হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাবে। ৯ জিলহজ ফজরের নামাজ আদায় করে আরাফাত ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করবেন। এখানে মসজিদুল নামিরায় খুতবা শুনবেন এবং মোনাজাতে শরিক হবেন। কাফনের কাপড়ের অনুরূপ দুই খণ্ড শুভ্র বসনে ইহ্রাম বেঁধে লাখ লাখ মানুষ আত্মসমর্পণ করেন মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে। গোনাহ মার্জনা আর বিশ্ব শান্তির জন্য দোয়ায় তাদের কান্নার ধ্বনি, পাপমোচনের ব্যাকুলতা, একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি, মোনাজাত-সৌহার্দ বিনিময়ের এ অভূতপূর্ব দৃশ্য স্মরণ করিয়ে দেয় মানবতার ধর্ম ইসলাম, শান্তির ধর্ম ইসলাম, ইসলাম ধনী-গরিবের ভেদাভেদহীন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। বিশ্ব শান্তি প্রত্যাশায় মুসলিম উম্মাহ আরাফাতে আবারও সমবেত হয়ে যে যার মতো ইবাদতে মশগুল হবেন। চারদিকে পাহাড়ঘেরা বিশাল আরাফাত ময়দানের মাঝে সাত লাখেরও বেশি মুসল্লির ধারণক্ষমতার মসজিদুল নামিরাহ ভোররাতের মধ্যেই পূর্ণ হয়ে যাবে। আরাফাত ময়দানের মসজিদুল নামিরাহতে খুতবা পাঠ করবেন পবিত্র মসজিদ, মসজিদুল হারাম-মক্কার ইমাম আবদুল আজিজ আল শাইখ। খুতবায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুসলিম উম্মাহকে একাত্ম হওয়ার আহ্বান জানানো হবে। মোনাজাতে বিশ্ব শান্তি, ভ্রাতৃত্ব, মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ ও ঐক্য এবং সারা দুনিয়ার মানুষের সুখ ও সমৃদ্ধি কামনা করে জ্ঞাত ও অজ্ঞাত গোনাহর জন্য মহান আল্লাহর দরবারে সবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হবে। এরপর আরাফাতেই এক আজানে জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন তারা। সন্ধ্যায় রওনা হবেন মুজদালিফার উদ্দেশে।
আরাফাত ময়দান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মুজদালিফায় রাত যাপন ও পাথর সংগ্রহ করবেন হাজীরা। রাতে তারা আবার এক আজানে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করবেন। পরদিন বৃহস্পতিবার ১০ জিলহজ ফজরের নামাজ আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় ফিরে আসবেন হাজীরা। মিনায় এসে বড় শয়তানকে পাথর মারা, কোরবানি ও মাথা মুণ্ডন বা চুল ছেঁটে মক্কায় কাবা শরিফ তাওয়াফ করার মধ্য দিয়ে হজের প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। হাজিরা তাওয়াফ শেষে মিনায় ফিরে গিয়ে ১১ ও ১২ জিলহজ অবস্থান ও প্রতিদিন তিনটি শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন। সৌদি সরকারের বিশেষ ব্যবস্থায় এবারও উন্মুক্ত ময়দানের সব তাঁবু কেবলামুখী করে বাঁধা হয়েছে। আরাফাত ময়দানে কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, হেলিকপ্টারসহ ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সার্বক্ষণিক টহল দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এবারও মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় ছোট ছোট অসংখ্য ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালে সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গরমের প্রকোপ বেশি থাকায় বিশাল ময়দানজুড়ে শত শত শীতল পানির ফোয়ারার মাধ্যমে পানি ছিটিয়ে তাপমাত্রা ঠাণ্ডা রাখা হচ্ছে। নিñিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরির জন্য মক্কা, মদিনা, মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় এবার মোতায়েন করা হয়েছে এক লাখেরও বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য।
সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান হচ্ছেন পবিত্র কাবা শরিফের জিম্মাদার। প্রতি বছরের মতো এবারও তিনি মক্কার গভর্নর প্রিন্স ফয়সল আল খালেদ, মসজিদুল হারামের সম্মানিত খতিব আবদুর রহমান আস সুদাইসিস’সহ অন্যদের নিয়ে পবিত্র কাবা শরিফ পরিষ্কার করেন। তার আগে তিবি কাবা গৃহের ভেতরে নামাজ আদায় করেন এবং নিজ হাতে রুমাল দিয়ে কাবা শরিফের দেয়াল পরিষ্কার করেন। নামাজ শেষে তিনি হাজরে আসওয়াদ চুমু খেয়ে কাবা শরিফের পুরনো ছবির প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। সবশেষে তিনি সবাইকে নিয়ে পবিত্র জমজমের পানি পান করেন।