ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৮:০৭ ঢাকা, মঙ্গলবার  ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ওঠে সকল অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিতে যে কোন মূল্যে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে।
তিনি বলেন, উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণে আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই। কোন পরিচয় বিচার না করে প্রত্যেক অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনপূর্ব পরিস্থিতির মতো আর কোন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পুনার্বৃত্তি দেখতে চাই না।
উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাট এবং দক্ষিণাঞ্চলের বরগুনা জেলার জেলা উন্নয়ন কমিটির সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, সরকার তার বর্তমান মেয়াদে দারিদ্র্যতা আরো ১০ শতাংশ কমাতে চায়। আর সে লক্ষ্যে সরকার দেশের প্রতিটি এলাকার দ্রুত উন্নয়ন করতে চায়।
তিনি বলেন, জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গৃহীত প্রকল্পসমূহ আমরা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চাই। আর এ ব্যাপারে আমরা সকলের বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের নির্বাহীদের সহযোগিতা চাই।
বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষ থেকে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী জেলা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কমিশনার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন বিভাগ ও অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম মোশাররফ হোসেন ভুইয়া ভিডিও কনফারেন্স পরিচালনা করেন। প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়নে তৃণমূল কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি যোগাযোগের অংশ হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকারের ২০০৯-২০১৩ মেয়াদে দেশের দারিদ্র্যতার হার ২৪ শতাংশ কমেছে। বর্তমান মেয়াদে আরো ১০ শতাংশ হ্রাস করতে চায় সরকার।
শেখ হাসিনা বলেন, সরকার প্রতিটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে চায়। তাই সরকার সার্বিক উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি কর্মসূচি ও অন্যান্য প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়ন চায়।
এ প্রসঙ্গে তিনি জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে গৃহীত বহুমুখী কর্মসূচিগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। একই সাথে তিনি কৃষি, এসএমই, যুব কল্যাণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ সার্বিক উন্নয়নে গৃহীত কর্মসূচিগুলোর প্রতিও নজর দেয়ার নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি বাড়ি একটি খামার কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তিনি বলেন, আমার সিদ্ধান্ত হচ্ছে বাংলাদেশে বাড়ি ছাড়া কোন মানুষ থাকবে না। তিনি জেলা কর্মকর্তাদের গৃহহীন মানুষের তালিকা প্রণয়ন এবং গৃহায়ন কর্মসূচি থেকে তহবিল নিয়ে বাড়ি তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীল। দেশের উত্তরাঞ্চলে এখন আর ‘মঙ্গার’ কথা শোনা যায় না। অথচ কয়েক বছর আগে প্রতি বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে এটা ছিল সাধারণ বিষয়।
তিনি বলেন, এখন ওই অঞ্চলের প্রতিটি লোকের কাজ আছে। দেশের প্রতিটি অঞ্চল বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলো, যেগুলো এক সময় অবহেলিত ও দারিদ্র্য কবলিত ছিল। সেসব এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের বিগত পাঁচ বছরের শাসনামলে আমরা রংপুরে ‘মঙ্গার’ কোন খবর পাইনি।
বরগুনা জেলা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ জেলাটি দেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত এবং এটি খুবই দুর্গম এলাকা।
১৯৯৬-২০০১-এর আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদকালে এ জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছে, যা এ অঞ্চলের সার্বিক আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বরগুনা জেলাটি একটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকাও ছিল। সেখানে সবসময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। ফলে এখানে জান-মালের অনেক ক্ষতি হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার প্রতি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের সমস্যা চিহ্নিত করেছে এবং উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তিনি আরো বলেন, দু’টি দূরবর্তী জেলার সঙ্গে তাঁর ভিডিও কনফারেন্স একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুত বাস্তবায়নের প্রকাশ।
শেখ হাসিনা বলেছেন, বর্তমান সরকার বরিশাল, বরগুনা ও পটুয়াখালীসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাবনা আবিস্কার করেছে। সরকার এ অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, পায়রা বন্দর স্থাপন করা হয়েছে এবং একটি নৌঘাঁটিরও নির্মাণের কাজ চলছে।
বরগুনা জেলার উন্নয়নে আরো প্রকল্প গ্রহণের ব্যাপারে স্থানীয় লোকদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বর্ষাকালে যাতায়াতের জন্য ফেরি সার্ভিস চালুসহ এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করে যাবে।
‘দেশের দক্ষিণাঞ্চল দীর্ঘকাল অবহেলিত ছিলো। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে আর অবহেলিত থাকবে না’- এ অঞ্চলের উন্নয়নে সম্ভব সবকিছু করা হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে একটি ক্যান্টনমেন্ট, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্লান্ট, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনর্নির্মাণ কারখানা স্থাপন করা হবে।
এর আগে বরগুনার একটি আসন থেকে তাঁর প্রার্থিতার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ জেলার জন্য তাঁর একটি দায়িত্ব রয়েছে। তিনি বলেন, জনগণকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে সুরক্ষার জন্য বরগুনায় আরো বহুমুখী সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ করা হবে।
স্থানীয় প্রতিনিধিদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দাবি জানানোর দরকার নেই। আমি জানি আপনাদের দাবি কি।’ তিনি জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সময়ে সময়ে কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন করার নির্দেশনা দেন। তিনি বরগুনায় নির্মাণাধীন ২৫০-শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে তাদের প্রতি সহযোগিতারও নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে এ অঞ্চলকে রক্ষায় জেলার সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা বরাবর সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, সবুজ বেষ্টনী আমাদের জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করতে পারে। তিনি জেলা প্রশাসন ও কোস্টগার্ডের প্রতি এই সমুদ্র তীরের জেলায় আরো বেশি গাছ লাগানো এবং সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়তার আহবান জানান।
প্রধানমন্ত্রী দরিদ্র রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকদের খোঁজ-খবর নেয়া এবং তাদের জীবন ও জীবনধারা বজায় রাখতে সহায়তা করার জন্য জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি আহবান জানান।
উত্তরাঞ্চলীয় লালমনিরহাট জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক সময় এটি ছিলো দারিদ্র্যকবলিত এলাকা। এখন পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটেছে। গাইবান্ধা, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলার অতি দরিদ্র অঞ্চলের প্রতি বিশেষ মনযোগ দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ট্রানজিট স্থাপনের বিষয় কার্যকর হলে লালমনিরহাট যথেষ্ট গুরুত্ব লাভ করবে। সীমান্তবর্তী ছিটমহল দহগ্রাম ও আঙ্গলপোতার বাসিন্দাদের ২৪ ঘন্টা চলাচলের সুযোগ দিয়ে ভারতের সঙ্গে একটি নিষ্পত্তিতে পৌঁছায় পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার তার গত মেয়াদে তিস্তা সেতু নির্মাণ করেছে এবং এ জেলায় ভুট্টা চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, সরকার শীতকবলিত এ জেলার লোকদের জন্য কম্বল পাঠাতে শুরু করেছে। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি শীতবস্ত্র বিতরণকালে ৬০-এর অধিক বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার রংপুরকে বিভাগীয় প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে এবং এর উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। সুতরাং একটি মহাপরিকল্পনার আওতায় এই বিভাগ তৈরিতে সময় লাগবে। তিনি একটি সৌন্দর্যমন্ডিত রংপুর সিটি প্রতিষ্ঠায় একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণেরও আহবান জানান।