Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

সকাল ১১:১৭ ঢাকা, সোমবার  ১৯শে নভেম্বর ২০১৮ ইং

লুৎফর রহমান বাদল
লুৎফর রহমান বাদল, ফাইল ফটো

আইএফআইসি’র ‘বাদল’ যেভাবে ক্ষমতা ও অর্থশালী হয়ে ওঠেন

লুৎফর রহমান বাদলকে কেলেঙ্কারির গুরু বলা হয়। শেয়ারবাজার থেকে ক্রীড়াঙ্গন, সর্বত্রই তার সদর্প বিচরণ। তার হাত এতটাই বিস্তৃত ও প্রসারিত যে নাগালে পাওয়া বেশ কষ্টকর। তাকে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। সর্বশেষ আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বাদলকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুত্রে জানা গেছে, গ্রাহকদের আমানত রক্ষার্থে বাংলাদেশ ব্যংকের গভর্নর আতিউর রহমান ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৯৯১ এর ৪৮ (১) ধারার আওতায় গঠিত স্থায়ী কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে তাকে অপসারণ করেন।

ঢাকা সিটি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৩ সালে হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বাদল এক বিএনপি নেতার  ছত্রছায়ায় পুঁজিবাজারে ঢোকার মাধ্যমে অর্থশালী হয়ে ওঠেন বলে মনে করা হয়।

অপরিচিত লতিফ সিকিউরিটিজের কর্ণধার হয়ে তিনি অল্প সময়ে বনে যান দেশের অন্যতম ধনকুবের। দুই বছরে জিএমজি এয়ারলাইন্স, ঢাকা ওয়েস্টিনসহ প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মালিক বনে যান লুৎফর রহমান বাদল। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিজনেস ক্যাপিটাল শেয়ার ও সিকিউরিটিজ, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, এলআর এ্যাগ্রো ফার্ম, ঢাকা-সাংহাই সিরামিক, এনটিভি, আরটিভি ও নুরানী হিমাগার। এর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকেই তিনি শেয়ারবাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

২০০৬ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি প্রথম আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হন। ২০১২ সালের ১১ জুলাই তিনি পুনঃনিয়োগ পান। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন।

২০১৫ সালের ৩০ জুনের তথ্য অনুযায়ী, আইএফআইসি ব্যাংকে বাদলের ২ কোটি ৫৭ লাখ ৮৩ হাজার ৪১৬টি শেয়ার রয়েছে। বৃহস্পতিবার ঢাকার পুঁজিবাজারে আইএফআইসি ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ার ২১ টাকা ৩০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে। এ হিসাবে ব্যাংকটিতে বাদলের প্রায় ৫৫ কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে।

ব্যাংক সুত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ তিনি আইএফআইসির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছাড়াও ব্যাংকের নির্বাহী কমিটি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ১৮টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। তার অনুপস্থিতির কারণে গত বছরের ১৪ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ব্যাংকটির নির্বাহী কমিটির কোনো সভা হয়নি।

বাদল পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউস লতিফ সিকিউরিটিজ এবং পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘নিউ ইংল্যান্ড ইকুইটি’র মালিক। বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, লুৎফর রহমান বাদল বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করে নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে তাদেরকে শেয়ারবাজারে আনেন।

২০১০ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি নিয়ে তদন্তে গঠিত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বাধীন কমিটির রিপোর্টে অভিযুক্তের তালিকায় তার নাম ছিল। অভিযুক্তের তালিকায় আরও ছিলেন বাদলের স্ত্রী  সোমা আলম রহমান, বাদলের স্ত্রীর বড় ভাই আহসান ইমাম ও তার স্ত্রী  মেহজাবীন  মোস্তফা ইমাম।

লুৎফর রহমান বাদলের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সূত্র মতে, কমিশন গত ২২ সেপ্টেম্বর দুদকের সহকারী পরিচালক এ এসএম সাজ্জাদ হোসেনকে অভিযুক্ত লতিফ সিকিউরিটিজ লিমিটেডের এমডি লুৎফর রহমান বাদলের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দুদকের উপ পরিচালক ঋত্বিক সাহার গত ২২ সেপ্টেম্বরের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশ নং-২৮০৩৮/১/২ মূলে সহকারী পরিচালক এ এসএম সাজ্জাদকে অনুসন্ধানী কর্মকর্তা নিয়োগের চিঠি জারি করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১০ সালে কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৪৩৬ কোটি টাকা লোপাটকারী ১২ ব্যক্তি ও ২ প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রামাণ পেয়েছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। ওই সময় এসইসির তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুদক অভিযুক্তদের নোটিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আর আলোচিত ওই ১২ ব্যাক্তির মধ্যে লুৎফর রহমান বাদলের নাম রয়েছে।

এছাড়াও বাদলের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় দায়ের করা নাশকতার মামলায় তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।

এর আগে সভাপতি ও পরিচালককে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের জের ধরে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর তাকে ক্রিকেট থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর বিকেএসপিতে লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ এবং প্রাইম ব্যাংকের খেলা শেষে আম্পায়ারিং নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করেন।

বিসিবির পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজনকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের কলঙ্ক  বলে অভিহিত করে লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের মালিক বলেছিলেন, ‘ও কোথায় নেই বিসিবি পরিচালকের পদ থেকে শুরু করে ক্লাব কর্মকর্তা, কোচ সবখানে আছে, নেই শুধু বিসিবির অফিস সহকারী রুস্তমের পদে।’

বর্তমানে তার নামের আগে পুলিশ জুড়ে দিয়েছে পলাতক উপাধি। তাতে কি আসে যায় তার হাত এতটাই লম্বা যে সুদূরে বসেও তিনি অনায়সেই নাড়াচড়া করাতে পারেন বলেই ধারণা সবার।