ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৬:৪৮ ঢাকা, বুধবার  ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

অনাদায়ী ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ তদন্তে নেমেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বিশেষ বিবেচনায় এবং ডাউন পেমেন্ট ছাড়া নবায়ন হওয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণের অর্থ আদায় হচ্ছে না। ওই ঋণ আবার খেলাপি হচ্ছে। এতে স্ফীত হচ্ছে খেলাপি ঋণের ভার। এর ফলে ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে ব্যাংকিং খাতে। তাই ঋণগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তদন্তে নেমেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ পরিদর্শন বিভাগের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। নাম রাখা হয়েছে ‘ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ বা সামু। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সূত্র জানিয়েছে, ঋণগুলো কিসের ভিত্তিতে নবায়ন করা হলো, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে খেলাপি হয়েছে, না অন্য পুরনো খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছে, এসব বিষয় খতিয়ে দেখতেই এ ইউনিট প্রাধান্য দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছরের শেষ সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু নিয়ে সরকার বিরোধীদলের অনড় অবস্থানকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে অনেক ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে পড়েন। ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের শেষ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ নবায়নে বিশেষ ছাড় দেয়। বলা যায় কোনো ধরনের ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ নবায়ন করা হয়।
ওই কর্মকর্তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত বছরের শেষ সময়ে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছিলেন তাদের ঋণ নবায়ন করার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ সুযোগে সম্পূর্ণ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অনেক পুরনো ঋণখেলাপিও তাদের ঋণ বিশেষ সুবিধায় নবায়ন করে নেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে খেলাপি না হয়েও এই বিশেষ সুবিধা নিয়েছেন। বিশেষ করে যেসব ঋণের বিপরীতে কোনো জামানত নেই, কারখানা দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে, ঋণের টাকা অন্য খাতে স্থানান্তর করেছেন, ওইসব ঋণও নবায়ন করা হয়।
 এর মধ্যে বেশি ঋণ নবায়ন হয় সরকারি ব্যাংকগুলোতে। এ সময়ে সরকার সমর্থক বড় বড় ব্যবসায়ী তাদের অনেক আগের পুরনো খেলাপি ঋণ নবায়ন করে নেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, সরকারি সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক প্রায় সাত হাজার কোটি, বেসরকারি ব্যাংকগুলো ছয় হাজার কোটি এবং বিশেষায়িত ও বিদেশী ব্যাংকগুলো আরো প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ঋণ নবায়ন করে বিশেষ সুবিধা নিয়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ নবায়ন করা হয় রূপালী ব্যাংকে এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংক দেড় হাজার কোটি, অগ্রণী ব্যাংক এক হাজার ৪০০ কোটি ও সোনালী ব্যাংক ৫৪৭ কোটি টাকার ঋণ নবায়ন করা হয়। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংক এক হাজার কোটি, এবি ব্যাংক ৩৩০ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক ৩২৬ কোটি, ইউসিবিএল ২৩৭ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ১০০ কোটি, পূবালী ব্যাংক ৬৩ কোটি ও প্রাইম ব্যাংক ১৭ কোটি টাকার ঋণ নবায়ন করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব ঋণ নবায়ন করা হলেও ওইসব ঋণের কিস্তি আর পরিশোধ হচ্ছে না। বিশেষ সুবিধায় নবায়ন হওয়া বেশির ভাগ খেলাপি ঋণই এখন নতুন করে খেলাপি হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে নতুন করে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি হয়েছে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত জুনে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা, গত সেপ্টেম্বর এসে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
অক্টোবর, নভেম্বরে খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে গেছে। এর ফলে ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বেড়ে যাচ্ছে ঝুঁকির পরিমাণ। কেনন, ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগ ঋণই সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ। শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময় শেষে সুদে-আসলে আমানতকারীদের ঠিকই পরিশোধ করতে হবে; কিন্তু ওইসব অর্থবিনিয়োগ করায় তা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এতে বেড়ে যাচ্ছে ঝুঁকির পরিমাণ। এ সম্ভাব্য এ পরিস্থিতি এড়াতেই বাংলাদেশ ব্যাংক নানা উদ্যোগ নিয়েছে। আর এর অংশ হিসেবেই সামু গঠন করা হয়েছে।

Like & share করে অন্যকে দেখার সুযোগ দিন