Sheersha Media

ব্রেকিং নিউজ

সকাল ৮:৪০ ঢাকা, বুধবার  ২১শে নভেম্বর ২০১৮ ইং

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে সন্তানদের মুক্ত রাখুন : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্তানদের অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্ত রাখতে এবং এ বিষয়ে তাদের সচেতন করে গড়ে তুলতে অভিভাবক-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে একযোগে কাজ করার আহবান জানান।

বিশিষ্ট লেখক ও অধাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গতকালকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারী কারা এটা হামলার ধরণ থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘যারা এই ঘটনাগুলো ঘটায় তারাতো ধর্মান্ধ। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল একটা অনুষ্ঠানে বসে ছিলেন, সেখানে তাকে ছুরি মারা হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ (এনএসটি) এবং গবেষণা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি সাথে সাথে এয়ার ফোর্সের হেলিকপ্টার পাঠিয়ে তাকে (অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল) ঢাকা সিএমএইচ এ নিয়ে আসেন উন্নত চিকিৎসার জন্য। জাফর ইকবালের অবস্থা এখন অনেকটাই স্টেবল, ভালো।

সরকার প্রধান বলেন, যারা এই ঘটনাগুলি ঘটায় তারা মনে করে একটা মানুষ খুন করলেই বুঝি তারা বেহেশতে চলে যাবে। তারা কোনদিন বেহেশতে যাবে না, তারা দোজখের আগুনে পুড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ নিরীহ মানুষকে হত্যা করলে কেউ বেহেশতে যেতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাহলে তারা এই অন্ধত্বে ভুগছে কেন? যদিও আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই বাংলাদেশে কোনরকম সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ আমরা চলতে দেব না। মাদকের বিরুদ্ধেও আমরা অভিযান চালাচ্ছি। আমাদের শিক্ষক, অভিভাবক, মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে অন্যান্য ধর্মের প্রত্যেককে যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই সকলের প্রতি আমি জঙ্গিবাদ বিরোধী আহবান জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, এমনকি তিনি যেসব পাবলিক মিটিং করেন সেখানেও তিনি আহবান জানান, মাদক,সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদ থেকে সকলে মিলে ছেলে-মেয়েকে মুক্ত রাখতে হবে এবং এজন্য যা যা করণীয় সবাইকে তাই করতে হবে।

এই সভার মাধ্যমেও এজন্য সবাইকে সজাগ থাকার আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী।

সিলেটের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গতকাল এক যুবকের অতর্কিত হামলায় ছুরিকাহত হন বরেণ্য লেখক ও অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সেখান থেকে পরে হেলিকপ্টারে করে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) এ স্থানান্তর করা হয়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা.আফম রুহুল হক। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে ১১৬ জনকে বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ, ২৩৫৮ জনকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ (এনএসটি) এবং ১৪১টি প্রকল্পকে গবেষণা অনুদান প্রদান করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী টোকেন হিসেবে ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে ফেলোশিপ ও অনুদানের চেক তুলে দেন।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী পরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, আমন্ত্রিত অতিথি এবং ফেলোশিপ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

সরকার দেশকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মাদক মুক্ত করতে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কি করছে তার প্রতি লক্ষ্য রাখারও আহবান জানান।

ছেলে-মেয়েদের যেন বাবা-মায়ের সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক হয়, বাবা-মাকে সন্তানরা মনের কথা খুলে বলতে পারে পরষ্পরের মধ্যে সে ধরনের একটা মানসিক যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ছেলে-মেয়েরা বড় হবার সময় একেক বয়সে তাদের একেক রকম মানসিক বৃদ্ধি ঘটে।

সেই বিষয়টির প্রতিও বাবা-মাকে নজর দেয়ার, বাবা-মা’কে আরো সহনশীল হবার এবং ছেলে-মেয়েরা যেন বিপথে না যায় তার প্রতি লক্ষ্য রাখার জন্যও প্রধানমন্ত্রী বাবা-মা, অভিভাবক,শিক্ষকদের প্রতি আহবান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এত মেধাবী ছেলে-মেয়ে তারা যেন কেউ বিপথে না যায় সেটাই আমরা চাই। কারণ দেশকে আমাদের সেভাবে গড়ে তুলতে হবে। আমরা আর পিছিয়ে যাব না। সামনের দিকে এগোবো এবং বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলবো।

বাংলাদেশের বিপুল সমুদ্র সম্পদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিজ্ঞানী ও গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে বিপুল সমুদ্র সম্পদ রয়েছে। ব্লু-ইকোনমির এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য বিজ্ঞানী ও গবেষকদের নতুন নতুন গবেষণা এবং উদ্ভাবনে কাজ করতে হবে।

‘সমুদ্র সম্পদ রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছি। যা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগবে। চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমুদ্র বিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদান করা হচ্ছে,’ -বলেন প্রধানমন্ত্রী।

কক্সবাজারে সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিউট প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সমুদ্রপাড়ে একটি সি অ্যাকুরিয়াম গড়ে তুলবো। এটি গবেষণায় যেমন প্রয়োজন, তেমনি পর্যটক আকর্ষণেও ভূমিকা রাখবে।

তিনি গবেষণার জন্য সরকারের জাহাজ ক্রয় সহ বিভিন্ন উদ্যোগের তথ্য এসময় তুলে ধরেন।

গবেষণায় সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের পাট তো ধ্বংস করেই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকে পাটকে আমরা বহুমুখী করার চেষ্টা করছি। গবেষণা করে পাটের জিনোম উদ্ভাবন করা হয়েছে।

সরকার প্রধান বলেন, ধানের গবেষণা করা হচ্ছে। বস্ত্রের উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ইনস্টিটিউট গঠন করা হয়েছে, যারা এসব ক্ষেত্রের উন্নয়নে কাজ করছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের পরমাণু কমিশন রয়েছে, যা জাতির পিতা করে দিয়ে গিয়েছিলেন। বর্তমানে আমরা পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ছি। এজন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকবল দরকার। সেভাবে ট্রেনিংও দেওয়া হবে। পরমাণু বিদ্যু কেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য বিজ্ঞানী ও গবেষক দরকার। কয়েকটা ধাপে এর নিরাপত্তা থাকবে। আমরা সেভাবেই পদক্ষেপ নিয়েছি।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা সমুদ্রের তলদেশে (নেভীর সাবমেরিন) গিয়েছি, স্যাটেলাইটও উৎক্ষেপণ হবে। অচিরেই যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে ।

বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনের কথা বিবেচনায় নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে ‘বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ অন সাইন্স এন্ড আইসিটি’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারই ধারাবাহিকতায় আমরা গঠন করেছি ‘বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট’। জাতীয় পর্যায়ে দক্ষ ও বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও গবেষক তৈরিই এ ট্রাস্টের উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ ছাড়াও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে এমফিল, পিএইচডি ও পিএইচডি-উত্তর পর্যায়ে ছাত্রছাত্রী ও গবেষকগণের মধ্যে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ প্রদান করা হচ্ছে।

তাঁর সরকার দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২১ সালের আগেই ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার সকল উদ্যোগ সম্পন্ন করেছি।

তিনি বলেন, আমাদের বিজ্ঞানীরা জীব-প্রযুক্তি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে লবণসহিষ্ণু এবং খরা-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এটি আমাদের মাইলফলক অগ্রগতি। বিজ্ঞানীরা ধানের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পরিবেশবান্ধব জীবানু-সার উদ্ভাবন করেছেন। হিউম্যান ডিএনএ প্রোফাইলিং সুবিধা সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। বস্ত্র, চামড়া ও ডিটারজেন্ট শিল্পে ব্যবহারের জন্য এনজাইম তৈরি সম্ভব হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী দিনে আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। প্রযুক্তিনির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক, দারিদ্র্যমুক্ত, মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়ার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

এই প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণের অংশ বিশেষ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘ঊনিশ’শ একাত্তর সালের ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখে আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংগ্রামের সমাপ্তি এবং অর্থনৈতিক মুক্তিযুদ্ধের শুরু। এই যুদ্ধে এক মরণপন সংগ্রাম আমরা শুরু করেছি। এই সংগ্রাম অনেক বেশী সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। তবে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থেকে কঠোর পরিশ্রম করি এবং সৎ পথে থাকি তবে, ইনশাল্লাহ জয় আমাদের অনিবার্য।’

গত ২০০৯-১০ অর্থ-বছর থেকে ২০১৬-২০১৭ অর্থ-বছর পর্যন্ত ৮ হাজার ১২ জন ছাত্রছাত্রী ও গবেষকের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ৪৯ কোটি ৪৫ লক্ষ ৬ হাজার টাকা ফেলোশিপ প্রদান করা হয়। বর্তমান ২০১৭-১৮ অর্থ-বছরে ফেলোশিপ প্রদানের লক্ষ্যে ১৪ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং ২০১৭-১৮ অর্থ-বছরে গবেষণা অনুদানের জন্য ১৪ কোটি ৪০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।